Description
"নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু, সুতরাং তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো…" [কুরআন ৩৫:৬]
তোমার দ্বীন শিক্ষা করো
বুদ্ধিমান ব্যক্তি সেই যে তার শত্রুর কৌেশল অধ্যয়ন করে এবং তাদের পরাজিত করার জন্য সতর্কতা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করে। "তোমাদের রব সতর্ক করেছেন, ‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু, সুতরাং তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো…’" [কুরআন ৩৫:৬]
শয়তান (ইবলিস)-এর ইতিহাস
শয়তানকে ধোঁয়াবিহীন আগুন থেকে সৃষ্টি করা হয়েছিল। যদিও সে ফেরেশতা ছিল না, তবুও আল্লাহর আনুগত্যের কারণে সে জান্নাতে ফেরেশতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিল। যখন আল্লাহ নবী আদম (আলাইহিস সালাম)-কে সৃষ্টি করলেন, তখন তিনি জান্নাতবাসীদের আদমকে সিজদা করতে আদেশ দিলেন, কিন্তু শয়তান অহংকার ও গর্ববশত তা প্রত্যাখ্যান করে বলল, "আমি তার চেয়ে উত্তম। তুমি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছ এবং তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছ।" [কুরআন ৭:১২]
আল্লাহ শয়তানকে অভিশাপ দিলেন এবং তাকে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করলেন। শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ চাইল, এবং আল্লাহ তাকে সেই অনুমতি দিলেন।
"[শয়তান] বলল, ‘কারণ তুমি আমাকে পথভ্রষ্ট করেছ, আমি অবশ্যই তোমার সরল পথে তাদের জন্য ওৎ পেতে বসব।" "তারপর আমি তাদের কাছে সামনে থেকে, পেছন থেকে, ডান দিক থেকে এবং বাম দিক থেকে আসব, এবং তুমি তাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ দেখতে পাবে না।" [কুরআন ৭:১৬-১৭]
শয়তানের ফাঁদ
আল্লাহর একত্বে অবিশ্বাস
ইসলামের ভিত্তি হলো আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস করা - যার কোনো অংশীদার, সমকক্ষ, পুত্র বা প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। অপরদিকে, সবচেয়ে বড় পাপ হলো আল্লাহর সাথে অংশীদার বা সমকক্ষ স্থাপন করা।
এর উদাহরণসমূহ হলো:
· আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উদ্দেশ্যে ইবাদত করা (যেমন সিজদা করা বা প্রার্থনা করা)।
· আল্লাহর কিছু গুণাবলি অন্য বস্তু বা সত্তার প্রতি আরোপ করা (যেমন মূর্তি বা তাবিজ)।
এটা দাবি করা যে আল্লাহর কোনো পুত্র, মা বা অন্য কোনো অংশীদার রয়েছে।
সুতরাং, মানবজাতিকে অবিশ্বাসের দিকে প্ররোচিত করাই শয়তানের প্রধান লক্ষ্য। তবে যদি শয়তান মানুষকে স্পষ্ট অবিশ্বাসের কাজে প্ররোচিত করতে না পারে, সে আরও সূক্ষ্ম উপায় অবলম্বন করে, যেমন কুসংস্কার, তাবিজ, জ্যোতিষশাস্ত্র এবং ভাগ্য গণনার প্রতি বিশ্বাস। এই ধরনের বিশ্বাসগুলি -একমাত্র আল্লাহই যে সমস্ত কিছুর উপর ক্ষমতা ও জ্ঞান রাখেন এবং একমাত্র তিনিই উপকার বা ক্ষতি করতে পারেন- এই সত্যের সাথে সাংঘর্ষিক।
ধর্মে বিদআত
"... আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন পরিপূর্ণ করেছি..." [কুরআন ৫:৩]
শয়তান মানুষকে ইসলাম ধর্মে এমন ভুল বিশ্বাস ও কাজ উদ্ভাবনের জন্য প্ররোচিত করবে, যা আল্লাহ বা নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আদেশ করেননি। আসলে, ইসলাম অসম্পূর্ণ বা আল্লাহর দ্বারা অপরিপূর্ণভাবে অবতীর্ণ হয়েছে ফলে এতে নতুন কিছু সংযোজন করা প্রয়োজন- এই ধরনের বিশ্বাস কুফর (অবিশ্বাস) বলে বিবেচিত হয়; কারণ এর মাধ্যমে আল্লাহর অবতীর্ণ বিধানকে প্রত্যাখ্যান করা হয়।
অনেক বিদআত এমনভাবে যত্নসহকারে পালন করা হয় যেন তা একটি ধর্মীয় ইবাদত, এবং আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়। এখানেই বিপদ নিহিত, কারণ যারা বিদআত পালন করে তারা বিশ্বাস করে যে তাদের কাজগুলো গ্রহণযোগ্য, অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা পাপ করছে।
এই বিদআতীরা তওবার প্রয়োজন অনুভব করবে না, কারণ তারা তাদের ভুল কাজকে চিনতে পারে না।
ফরজ কাজ অবহেলা করা
"নিশ্চয়ই, সালাত অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে…" [কুরআন ২৯:৪৫]
"আর শয়তান চায় যে, সে তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে বিরত রাখবে…" [কুরআন ৫:৯১]
আল্লাহ প্রত্যেক মুসলিমের ওপর কিছু কাজ ফরজ করেছেন, যার মধ্যে সবচেয়ে নিয়মিত হলো পাঁচ ওয়াক্ত সালাত। তাই শয়তান আমাদের সালাতের ব্যাপারে উদাসীন করার চেষ্টা করে, যাতে আমরা আরও পাপের মধ্যে জড়িয়ে যাই।
ক্রমিক ধোঁকাবাজি
নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে মূর্তিপূজা শুরু হয়েছিল, যা শয়তানের ধীরে ধীরে এবং ধৈর্যশীল পদ্ধতিকে তুলে ধরে। একদল নেককার ব্যক্তি মারা যাওয়ার পর, শয়তান তাদের আশেপাশের লোকদেরকে তাদের সম্মানে এবং তাদের নেক আমল স্মরণ করানোর জন্য মূর্তি স্থাপন করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। যখন সেই প্রজন্ম বিদায় নিল এবং লোকেরা ভুলে গেল কেন মূর্তিগুলো স্থাপন করা হয়েছিল, শয়তান তাদের ধোঁকা দিলো যে তাদের পূর্বপুরুষরা এই মূর্তিগুলো পূজা করত এবং এর মাধ্যমেই বৃষ্টি আসত। এরপর মানুষ এই মূর্তিগুলো পূজা করতে শুরু করল।
এই ক্রমিক ধোঁকাবাজি বহু উপায়ে ব্যবহার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, শয়তান মানুষকে হারাম যৌন কর্মে প্ররোচিত করে: এটি শুরু হয় একটি দৃষ্টির মাধ্যমে,
যা একটি চিন্তায় নিয়ে যায়, তারপর একটি হাসি, তারপর নিরীহ মনে হওয়া কথোপকথন, তারপর নির্জনতা এবং অবশেষে সেই পাপ।
একইভাবে, মানুষের ফরজ ইবাদত বন্ধ করার প্রয়াসে, শয়তান প্রথমে মানুষকে তাদের নফল ইবাদত ছেড়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করে, যার ফলে তারা ফরজ ইবাদতে অলস হয়ে পড়ে। সে ছোট গুনাহকে তুচ্ছ ভাবতে বাধ্য করে,
যার ফলে শেষ পর্যন্ত তারা বড় গুনাহের দিকে গড়িয়ে পড়ে।
মন্দ কাজকে সুন্দর করে উপস্থাপন করা
"... এবং শয়তান তাদের কৃতকর্মকে তাদের কাছে সুন্দর করে উপস্থাপন করল।" [কুরআন ৬:৪৩]
শয়তান মানুষের নিকট পাপকে আকর্ষণীয় রূপে উপস্থাপন করে, যেমন সে আদম ও হাওয়াকে গাছের ফল খাওয়ার জন্য ধোঁকা দিয়েছিল।
শয়তান আদমের কাছে ফিসফিস করে বলল,
"হে আদম! আমি কি তোমাকে চিরস্থায়ী জীবনের বৃক্ষ এবং অবিনশ্বর রাজ্যের পথ দেখাব?" [কুরআন ২০:১২০] "তোমাদের রব এই গাছ থেকে তোমাদেরকে শুধুমাত্র এজন্য নিষেধ করেছেন যাতে তোমরা ফেরেশতা না হয়ে যাও বা চিরকালীন না হয়ে যাও…" "এবং আমি তোমাদের একজন আন্তরিক পরামর্শদাতা।" "অতঃপর সে তাদের ধোঁকায় ফেলে দিল।" "যখন তারা সেই গাছের স্বাদ গ্রহণ করল… তাদের রব তাদেরকে ডাক দিলেন।" "আমি কি তোমাদেরকে এই গাছ থেকে নিষেধ করিনি এবং তোমাদেরকে বলিনি যে শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?" [কুরআন ৭:২০-২২]
যদিও আদম অসংখ্য হালাল খাদ্যের মধ্যে ছিলেন, শয়তান তাকে নিষিদ্ধ গাছ থেকে খেতে প্ররোচিত করেছিল। একইভাবে, শয়তান মানুষকে অনুমোদিত কাজের পরিবর্তে নিষিদ্ধ কাজে প্ররোচিত করে, যেমন বিবাহের পরিবর্তে ব্যভিচার, কুরআনের পরিবর্তে গান-বাজনা, হালালের পরিবর্তে হারাম উপার্জন,
এবং বিশাল পরিমাণের পবিত্র ও হালাল খাদ্যের বিপরীতে অল্প কিছু নিষিদ্ধ খাদ্য ও পানীয়।
লালসা জাগিয়ে তোলা
"শয়তান তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং তাদের লালসা উসকে দেয়। বস্তুত শয়তান কেবলমাত্র তাদেরকে কেবল ধোঁকাই দেয়।" [কুরআন ৪:১২০]
প্রত্যেক মানুষের মাঝে লালসা ও প্রলোভন রয়েছে। শয়তান এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মানুষকে পরিণতি না ভেবে তাত্ক্ষণিক সুখে লিপ্ত হতে প্ররোচিত করে। এর ফলে অবধারিতভাবে অনুশোচনা ও লাঞ্ছনা আসে, হয় এই জীবনে অথবা কিয়ামতের দিনে।
সময় অপচয়
যদি শয়তান কাউকে পাপে লিপ্ত করতে না পারে, তবে সে তাকে এমন কাজে ব্যস্ত রাখে যা কোনো উপকার বয়ে আনে না। সময়কে বুদ্ধিমানের মতো ব্যবহার করে অগ্রাধিকারমূলক কাজ সম্পন্ন করা এবং উচ্চ লক্ষ্য অর্জনের পরিবর্তে,
শয়তান আমাদেরকে অকাজের কাজে ব্যস্ত রাখে।
শয়তানকে পরাজিত করার উপায়
"নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু; সুতরাং তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো…" [কুরআন ৩৫:৬]
প্রথম ধাপ হলো শয়তানকে শত্রু হিসেবে চেনা: যদি তুমি তোমার শত্রুকে চেনো, তবে তুমি তাকে পরাজিত করতে পারবে। শয়তানের শক্তি মূলত তার ধোঁকা দেওয়ার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, তাই আমাদের তার চতুর কৌশল ও পদ্ধতি বুঝতে হবে যাতে আমরা নিজেদের ভালোভাবে রক্ষা করতে পারি।
আল্লাহর সাহায্য চাওয়া
আল্লাহর কাছে তাঁর আশ্রয় চাওয়া এবং শুধুমাত্র তাঁর উপর সাহায্যের জন্য নির্ভর করা শয়তানকে পরাজিত করার একটি মাধ্যম। কুরআনের সূরা আল-ফালাক ও আন-নাস নিয়মিত পড়ে শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া যেতে পারে। আমাদের বুঝতে হবে যে যতদিন আমরা জীবিত আছি, শয়তান আমাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা কখনোই বন্ধ করবে না। আমাদের সবসময় সতর্ক থাকতে হবে এবং আল্লাহর কাছে নিয়মিত হিদায়াত ও আশ্রয় প্রার্থনা করতে হবে।
ক্ষমাপ্রার্থনা করুন
নবী (ﷺ) বলেছেন: “যে পাপ থেকে তাওবা করে সে এমন যেন তার কোনো পাপ নেই।” - ইবনে মাজাহ
যদি আমরা শয়তানের ষড়যন্ত্রে হার মানি, তবে আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণায় এখনও আমাদের ভুলগুলোকে স্বীকার করে আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হয়ে ভুল সংশোধন করার সুযোগ রয়েছে।
নবী (ﷺ) বলেছেন: “শয়তান মহিমাময় প্রভুকে বলল, ‘হে প্রভু, আমি আপনার দাসদের বিভ্রান্ত করতে থাকব যতক্ষণ তাদের আত্মা তাদের দেহে থাকবে।’ প্রভু বললেন, ‘আমার মহিমা ও শ্রেষ্ঠতার কসম, আমি তাদের ক্ষমা করতে থাকব যতক্ষণ তারা আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে।’” - আহমাদ
তওবা গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য এটি আন্তরিক হতে হবে এবং সেই পাপে আবার না জড়ানোর দৃঢ় সংকল্প থাকতে হবে।
পাপের পরিবেশ এড়িয়ে চলুন
যখন আল্লাহ আদমকে একটি বিশেষ গাছ থেকে নিষেধ করেছিলেন, তিনি বলেননি: "এই গাছ থেকে খেও না," বরং তিনি বলেছিলেন: "তোমরা এই গাছের কাছেও যেও না।" [কুরআন ২:৩৫] তাই আমাদের অবশ্যই এমন কিছু থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে যা পাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
সৎ সঙ্গ বজায় রাখুন
আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উপদেশ দিয়েছেন, "মানুষ তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুর পথ অনুসরণ করে, তাই ভালো করে দেখো কাকে তুমি বন্ধু বানাচ্ছ।" [তিরমিজি]
তোমার সঙ্গ তোমার সিদ্ধান্ত ও কাজকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। সৎ বন্ধুরা তোমাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করাবে এবং ভালো কাজ করতে উৎসাহিত করবে, অন্যদিকে খারাপ সঙ্গ তোমাকে শয়তানের দিকে নিয়ে যাবে।
সৎ কাজ করো
ধর্মীয় কাজে, বিশেষ করে সালাতে ব্যস্ত থাকা শয়তানকে পরাজিত করার একটি চমৎকার মাধ্যম। যদি কেউ তার সময় ভালো কাজে ব্যয় করে, তবে শয়তানের চক্রান্তে প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
"যদি শয়তানের পক্ষ থেকে কোনো মন্দ পরামর্শ তোমার কাছে আসে, তবে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।" [কুরআন ৭:২০০]
উপসংহার
শয়তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তখনই জেতা সম্ভব যখন আমরা তার ফাঁদ সম্পর্কে সচেতন থাকব এবং তাকে পরাজিত করার কৌশলগুলো প্রয়োগ করব। কিয়ামতের দিন শয়তান তার পাপ ও দুর্নীতির কথা স্বীকার করবে। সে সমস্ত সৃষ্টি জগতের সামনে ঘোষণা করবে যে আল্লাহই সত্য বলেন এবং সে (শয়তান) মিথ্যাবাদী।
আমরা মহান আল্লাহর নিকট তাঁর সুন্দরতম নাম ও মহান গুণাবলীর ওসিলায় প্রার্থনা করি যে, তিনি আমাদের পাপ ক্ষমা করুন এবং শয়তানের ফাঁদ থেকে আমাদের রক্ষা করুন।
